মেসোপটেমিয়া সভ্যতা: ( History Of Mesopotamia )

                                   

    :  মেসোপটেমিয়া সভ্যতার অবদান ও ইতিহাস :

  ➲  পারস্য উপসাগরের উত্তরে বর্তমানে যে দেশটির নাম ইরাক সেটিই একসময় মেসােপটেমিয়া বলে ছিল ইতিহাসে বিখ্যাত। অবশ্য এটা সেই প্রাচীনকালের কথা।গ্রীকরাই দিয়েছিল এই নাম। এর অর্থ হল দুই নদীর মধ্যবর্তী দেশ। এক কথায় একে বলা চলে দোয়াব অঞ্চল।
 আসলে  মেসােপটেমিয়াকে ঘিরে বয়ে গিয়েছে দুটি নদী টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস। এই নদী দুটির জলে ধৌত ও পলিমাটিতে ভরা অঞ্চলটি ছিল খুবই উর্বর—চাষবাসের আদর্শ ভূমি। আনুমানিক ছ'হাজার বছর আগে এই অঞ্চলে সভ্যতার প্রথম সােনালি আলাে দেখা যায়। এখানে অনেক ঢিপির মতাে ছােট ছােট পাহাড়ও রয়েছে। এগুলােকে বলে ‘টেল '। পরবর্তীকালে এসব ‘টেল’ খুঁড়ে মাটির
বিভিন্ন স্তরে মেলে বসতির নানা চিহ্ন আর ধ্বংসাবশেষ। আর এসব ধ্বংসাবশেষই জানিয়ে দেয় এখানে সভ্যতা ছিল এবং তা ব্রোঞ্জ যুগেরই সাক্ষ্য বহন করছে।

বস্তুত, এই অঞ্চলে একসময়ে অনেক স্বাধীন স্বতন্ত্র নগররাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল।মেসােপটেমিয়ার নীচের দিকের অংশের নাম সুমের। এই সুমেরকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল মেসােপটেমিয়ার সভ্যতা। সুমেরিয়ার অধিবাসীদের বলা হত সুমার। 'সুমার’ শব্দটির অর্থ হল কালাে চুলের মানুষ। সুমাররা ছিল যথেষ্ট খাটিয়ে মানুষ। যেমন,তারা মেহনত করতে পারত তেমনি ধরত যথেষ্ট বুদ্ধি। শ্রম. ও বুদ্ধির মিশ্রণে কয়েকশাে বছরের মধ্যে এখানে গড়ে ওঠে সভ্যতা।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, মানুষ যখন প্রথম এই অঞ্চলে বসবাস করা শুরু করে তখন বেশির ভাগ এলাকাই ছিল জলাভূমি। ছিল জঙ্গলও। জলা জায়গায় মিলত প্রচুর মাছ, আসত আর পাখিও দেখা যেত। বালিয়ারিতে জন্মাত প্রচুর খেজুর গাছ। ফলে গৃহপালিত পশুর মিলত অঢেল খাবার। নদীতে দেখা দিত বন্যা। ফলে পড়ত পলিমাটি। ক্রমে ক্ৰমে এলাকাটা হয়ে উঠল উর্বর। আবহাওয়াও ছিল উষ্ণ। সব মিলিয়ে অঞ্চলটি যেমন বসতির উপযােগী ছিল তেমনি ছিল কৃষির স্বর্ণ-অঞ্চল। ফসলের মধ্যে বেশি হত গম ও যব। এখানকার মানুষেরা প্রাণধারণের জন্য সজিও ফলাত। শণের
চাষও করত। খেজুরের চাষ চলত। 

 কালক্রমে খেজুর গাছ তাদের কাছে হয়ে ওঠে জীবনদায়ী বৃক্ষ। এজন্য খেজুর গাছের অন্য নাম হয় এদের কাছে জীবনবৃক্ষ। রোজকার জীবনে এই গাছ অনেক কাজে লাগতো।নদীর দুই রূপ। একইসঙ্গে তা যেমন আশীর্বাদ তেমনি অভিশাপও। বন্যার ফলে যেমন পলিমাটি জমত, জমি উর্বর হয়ে চাষের উপযােগিতা বাড়াত তেমনি বন্যা ভাসিয়ে দিত ঘরবাড়ি, মানুষ মারা যেত, মারা পড়ত গৃহপালিত জীবজন্তু। জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই এখানকার মানুষ বুঝল এই নদীকে বাঁধতে না পারলে বন্যায় শেষ হয়ে যেতে হবে। তাই তারা নদীকে বাঁধবার চেষ্টা চালাল। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর তারা একাজে সফল হল। জায়গায় জায়গায় বাঁধ দিল—মাটির উঁচু বাঁধ। এতে বন্যার জল ঠেকানাে সম্ভব হল না। পাশাপাশি চওড়া চওড়া খাল কেটে জলনিকাশের ব্যবস্থা করল।

বাঁধ দিয়ে যে বন্যার জল ধরে রাখত তাকে ব্যবহার করা হল চাষের কাজে।এখানকার মানুষদের প্রধান জীবিকা হয়ে পড়ল তাই কৃষি ও পশুপালন। কিন্তু তাতেই তাে আর বেঁচে থাকা যায় না। জীবনের আরাে অনেক চাহিদা থাকে। চাষের জন্য যন্ত্রপাতিদরকার। দেখতে দেখতে নানা ধরনের বৃত্তিজীবী দেখা দিল। কামার, কুমাের, জেলে, ছুতাের, তাঁতি, সেঁকরা, রাজমিস্ত্রি ইত্যাদি বিভিন্ন পেশার মানুষের আবির্ভাব ঘটল।

সভ্যতার বিকাশ হতে থাকল। সমাজ বাড়তে থাকল। ফলে এখানকার অধিবাসীদের মধ্যে দেখা দিল শিক্ষার প্রয়ােজনীয়তা—এলেন শিক্ষক। এলেন পুরােহিত। সৈনিকেরও প্রয়ােজনীয়তা অনুভূত হল। মজুর তৈরি হল। চালু হল ব্যাবসা-বাণিজ্য। ব্যবসা- বাণিজ্যের তাগিদেও দেখা দিল কেরানিকুল। পুরােহিতরাই হয়ে উঠল সমাজের প্রধান।তারাই দেশের শাসক। 

বয়ন ও ধাতুশিল্পেও এই অঞ্চলের মানুষ করলাে যথেষ্ট উন্নতি।সুমাররা ছড়িয়ে পড়ল দিকে দিকে। বিস্তৃত হতে লাগল তাদের বসতি।তুলল তারা অনেক নগর ও জনপদ। এই নগর ও জনপদগুলাে ছিল স্বাধীন ওস্বতন্ত্র। এরকমই এক প্রাচীন নগরের নাম ছিল আক্কাদ। সুমেরের উত্তরে ছিল এর অবস্থান। এই আক্কাদ নগরকে ঘিরে একটি শক্তিশালী রাজ্য সেকালে গড়ে উঠেছিল এখানকার লােকেরা ছিল ভিন্ন জাতির। পরবর্তী সময়ে সুমেরু ও আক্কাদ ঐক্যবদ্ধ হয়। 

গড়ে উঠল শক্তিশালী এক রাজ্য।নগরগুলাে ছিল উঁচু পাঁচিল আর চওড়া খাল দিয়ে ঘেরা। ফলে তা ছিল বেশ সুরক্ষিত। তবে নগরের রাস্তাগুলাে মােটেই চওড়া ছিল না। বরং তা ছিল সরুই।রােদে পােড়ানাে ইট দিয়ে তারা ঘরবাড়ি বানাত। পরবর্তীকালে কাঠ ও পাথরের ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়।

 অনেক বাড়ি ছিল আবার দোতলা। সুমেরীয় সভ্যতা স্থাপত্য ও শিল্পসমৃদ্ধ ছিল। ধর্ম, দেবতা ও দেবমন্দির এই সভ্যতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করেছিল। বড়াে বড়াে মিনার বানিয়ে দেবমন্দির তৈরি করা হত।দেবতাদের মধ্যে প্রধান ছিলেন ভূমিদেবতালিপ’ ও জলদেবতা ‘এনকি মন্দিরেদেওয়াল ছিল চিত্রবিচিত্র। নানারঙের ঝিনুক ও পাথর বসিয়ে ছবি আঁকা হত।কখনও কখনও ধাতু বা হাতির দাঁতের ওপর কারুকার্য করে দেয়ালে আটকানাে হত।

পাথর কুঁদে কুঁদে তারা দেবতা, জীবজন্তু ও মানুষের মূর্তি গড়ত। পাথর কেটে তৈরি করত বাসনপত্র। দামি পাথর ঘসে পালিস করে তারা অলঙ্কার নির্মাণ করত। তাতে নক্স কাটা হত, বসানাে হত দামি পাথর। সােনা ও রুপাে দিয়ে তারা গয়না বানাত।ইটের দেয়ালে এঁকে রাখত সুন্দর সুন্দর ছবি।সুমেরীয় সভ্যতা তথা মেসােপটেমিয়ার সভ্যতাসমৃদ্ধ মানুষেরা ধাতুশিল্পেও ছিল খুব নিপুণ। তামা ও ব্রোঞ্জের ছিল ব্যাপক প্রচলন। তা দিয়ে তারা তৈরি করত যন্ত্রপাতি ও অস্ত্রশস্ত্র। কখনও কখনও তামা ও ব্রোঞ্জ গলিয়ে ছাঁচে ফেলে বানাত নানা ধরনের জিনিস।

পরিবহন ও বাণিজ্যেও তারা অসামান্য কৃতিত্ব প্রদর্শন করে। কুমােরের চাকা দেখে তারা প্রথম চাকাওয়ালা গাড়ি ব্যবহার করতে শিখল। এসব গাড়ি টানত পশুরা। জলপথে চলত নৌকো। পাল তুলে তারা পাড়ি জমাত দূর-দূরান্তে। চলত ব্যবসা-বাণিজ্য। এভাবেই তারা সভ্যতার উষালগ্নে পালতােলা নৌকায় চেপে ভারতের সিন্ধু অঞ্চলের অধিবাসীদের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করত। পশমের কাপড়, গম, যব,ফল পাঠাত ভারতে আর ভারত থেকে সেখানে যেত তাদের দরকারি জিনিসপত্র,বিনিময়ের মাধ্যম ছিল রুপাের টাকা।সুমেরের লােকেরা শুধু স্থাপত্যে, শিল্পে ও ব্যবসা-বাণিজ্যেই দক্ষতা দেখিয়েছে তা নয়, মানব সভ্যতার ইতিহাসে তাদের অবদান আরও অনেক বিষয়েই উজ্জ্বল।

তাদের অর্থাৎ সুমেরীয় সভ্যতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হল তাদের লিপি। এই লিপি ছিল কীলকাকৃত লিপি। এখানকার লােকেরা নরম মাটির টালিতে নলখাগরার কলম দিয়ে নানান কথা লিখে রাখত


 পরে টালিগুলােকে আগুনে পােড়াত। লেখাগুলাে ছিল তীরের ফলার মতাে দেখতে। সুমেরীয় সভ্যতার উজ্জ্বলতম অবদান এই কীলকাকৃত লিপির সাহায্যে তারা চিঠিপত্র লিখত, হিসাবপত্র রাখত, এমনকি বই-ও লিখত।



আরো দেখুন 📖 আলীগড় মুভমেন্ট  / 📖 নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু 


Post a Comment

If You Have Any Doubts, Please Let Me Know

নবীনতর পূর্বতন