⭕     সেই অলৌকিক ট্রেনযাত্রা ও ছোটদাদু   ⭕

                                                  লেখকঃ  সন্তোষ  চট্টোপাধ্যায় 
                           

আজ কয়েকদিন ধরেই বারবার ছােটদাদুর কথা আমার মনে পড়ছিল। ছােটদাদু মানে আমার মায়ের ছােটমামা : শরদিন্দু- মুখােপাধ্যায়। তিনি আজ বিশবছরের মতাে আগে মারা গেছেন।
ছােটদাদু থাকতেন আসামের পাণ্ডুয়ায়। তিনি রেলের বড়াে কর্মচারি ছিলেন। কিন্তু সেকথায় পরে আসছি।

ছােটদাদুর কথা বারবার মনে পড়ার কথাই ভাবতে ভাবতে হঠাৎই ডাকপিওনের ডাকে নীচে ছুটে গেলাম। আমার নামে একখানা রেজিস্টারি প্যাকেট এসেছিল। সই করে প্যাকেটটা নিয়েই দেখলাম সেটা এসেছে গৌহাটি থেকে।

প্যাকেটটা মােটা খাতার মতাে আর সেটা আমাকে পাঠিয়েছে আমারই মামাতাে ভাই ছােটদাদুর ছেলে
সমরেশ। টেলিপ্যাথি সম্পর্কে আমার কোনও ধারণা ছিল না। যতদূর জানি কোনও ব্যাপার নিয়ে ভাবনার মাঝখানে সেটা অনেক সময় বাস্তবে সত্যি হয়ে ওঠে। কদিন ধরে যে ছােটদাদুর কথা ভাবছিলাম আর তারপরেই তার ছেলের পাঠানাে রেজিস্টার্ড প্যাকেট এসে পৌঁছল এটাই আমাকে নিদারুণ আশ্চর্য করে দিয়েছে তাতে সন্দেহ ছিল না । তাড়াতাড়ি প্যাকেটটা খুলতেই পেলাম একখানা চিঠি আর একটা ডায়রী। চিঠিটা খুলতেই ছােটদাদুর কথাটা আরও বেশি করে আমাকে উতলা করে তুলল। সমরেশ যা লিখেছিল তা এই রকম :

প্রিয় সন্ত,
অনেক দিন হয় তােদের কোনও চিঠি পাইনি। আমারও কলকাতা যাওয়া হয়ে ওঠেনি। যেমনই হােক সকলে ভালাে আছিস নিশ্চয়ই। চিঠির সঙ্গে বাবার একটা ডায়েরী পাঠালাম। বাবার জীবনে কত কিছু যে ঘটেছিল সে সব তাে তাের জানা আছে। এই ডায়েরীটা বাবা তােকে দেবার কথা আমাকে বলেছিলেন কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার এটার খোঁজ আগে পাইনি। একটা পুরনাে সুটকেশ ঘাঁটতে গিয়ে
হাতে পেয়েছি। তােকে ডায়েরীটা পাঠালাম এটা পড়ে কোনওভাবে প্রকাশ করা যায় কিনা তুই একটু ভেবে ব্যবস্থা করিস। 

আশ্চর্য এই কাহিনি—অলৌকিক, সহজে বিশ্বাস করা শক্ত। তবে বাবার অ্যাডভেঞ্চারে ভরা
জীবনের এও এক উদাহরণ তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তাের চিঠির আশায় রইলাম।-ভালােবাসা নিস,
ইতি- তাের সমরেশদা।

চিঠিটা পড়ে অবাক হইনি কারণ ছােটদাদুর জীবনে আশ্চর্য সব ঘটনা বারবার ঘটেছে। ছােটদাদুর মুখে সে সব কাহিনি শুনে আশ্চর্য হয়েছি আমরা। এবার ছােটদাদুর কথা একটু বলা দরকার। ছােটদাদু ছিলেন চমৎকার স্বাস্থ্যের অধিকারী। দুর্জয় সাহসী আর অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়। ভয়ডর যেমন ছিল না
তার তেমনই ছিল মানুষের প্রতি ভালােবাসা। সবারই প্রিয় ছিলেন তিনি। চমৎকার হকি খেলতেন। বেটন কাপেও আসামের হয়ে খেলেছেন। এ কাহিনি ছােটদাদুর জীবন কাহিনিরই অংশ। তাই
আসল কাহিনি প্রকাশের আগে ছােটদাদুর সম্পর্কে সামান্য আরও কিছু বলা বােধ হয় অপ্রাসঙ্গিক হবে না। ছােটদাদু প্রথমে রেলের ইঞ্জিন ড্রাইভার হয়ে কাজে যােগ দিয়েছিলেন। অবাক হওয়ার কিছু নেই কারণ তখন, মানে, স্বাধীনতালাভের কয়েকবছর আগে আসাম মেলের ড্রাইভারের চাকরি পাওয়া বেশ কঠিনই ছিল। তখন এ চাকরি বাঁধা ছিল অ্যাংলাে ইন্ডিয়ানদের। গার্ডের চাকরিও তাই বাঙালি ছেলেরা বড়াে একটা সুযােগ পেত না। ছােটদাদুর চমৎকার স্বাস্থ্য আর সাহস তাকে সুযােগ দিয়েছিল।

ছােটদাদু আসাম মেলের ড্রাইভার হিসেবে সারা আসাম চষে বেড়িয়েছিলেন। নানা আশ্চর্যজনক ঘটনা তার জীবনের সঙ্গে ওতপ্রােতভাবেই জড়িয়ে গিয়েছিল। আসাম মেল ছিল সেই আমলের বিখ্যাত ট্রেন। তখন বাংলাদেশের জন্ম হয়নি। আসাম মেল চলত অবিভক্ত বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে। বিখ্যাত স্টেশন ছিল এই লাইনের পার্বতীপুর জংশন আর রংপুর। 
           


এছাড়া আসাম গৌহাটি, ডেমপুর আর ডিব্ৰুগড়। পদ্মানদীর বুকে ঈশ্বরদীর কাছে ছিল সারা সেতু।
ছােটদাদু শিকারেও দক্ষতা অর্জন করেছিলেন আর একবার বাঘও মেরেছিলেন। যেমনই হােক ছােটদাদুকে নিয়ে আমাদের গর্বের শেষ ছিল না। অনেক গল্পই তার কাছে শুনেছিলাম। এবার তার পাঠানাে ডায়েরির কথায় আসা দরকার। ডায়েরিটা আগা গােড়া পড়তে দেরি করিনি। এ এক আশ্চর্য কাহিনি। ছােটদাদুর জীবনেরই কাহিনি। এখানে ছােটদাদুর জবানীতেই কাহিনিটি পাঠকদের
সামনে তুলে ধরলাম। “ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে আর পড়ার ইচ্ছে ছিল না। দেশে চলেছিল জোরদার স্বাধীনতার লড়াই।

 দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেরও তখন প্রচণ্ড উত্তাপ। বাবা বললেন একদিন : কিরে বিণু, চাকরি করতে
ইচ্ছে আছে? আমি অবাক হয়ে গেলাম। চাকরি! ‘হ্যা, রেলে চাকরি। আসাম মেলের ড্রাইভার। ইচ্ছে
থাকলে এখনই আমার সঙ্গে সাহেবের কাছে চল। কি জানি কেন বাবার উৎসাহ দেখে আমিও রাজি হয়ে গেলাম। বাবা আমাকে নিয়ে গেলেন আসাম মেলের গার্ড জনস্টন সাহেবের কাছে। বাবাও রেলে চাকরি করতেন, সাহেবের সঙ্গে তার খুবই হৃদ্যতা। জনসন সাহেব নাম হলেও তিনি অ্যাংলাে ইন্ডিয়ান।

আমাকে দেখে সাদরে হাতধরে ঝাকুনি দিলেন, ‘হ্যাল্লো ইয়ংম্যান, ড্রাইভারের চাকরি পারবে তাে?
‘নিশ্চয়ই পারবাে স্যার’, বললাম। সাহেব একজনকে ডেকে বললেন, ‘গােমেজকে ডেকে আনাে শিগ্রিরই। সে এসে দাঁড়ালাে তাকে দেখে চমকে গেলাম। প্রায় ছ'ফিট লম্বা বিশাল দেহী একজন মানুষ গায়ের রঙ প্রায় বাদামী। মুখে হাসি। ‘গােমেজ, লুক অ্যাট দা ইয়ংম্যান, সাহেব বললেন
আমাকে দেখিয়ে। আজ থেকে এ হবে তােমার অ্যাসিস্ট্যান্ট। চলবে?
গােমেজ হাসল, ইয়েস স্যর, গুড হেলথ।


সেই শুরু। গােমেজ আমাকে সঙ্গে নিয়ে নিজের ঘরে এল। গােমেজকে দারুণ পছন্দ হয়ে গেল আমার। গােমেজও আমাকে স্নেহের চোখেই দেখা শুরু করেছিল। কাজটা দারুন খাটুনির। এ আজকালকার ইঞ্জিন নয়। কয়লার ইঞ্জিন। দারুন উত্তাপ ইঞ্জিনে। কথায় কথায়। জেনেছিলাম গােমেজ একজন গােয়ানিজ। তার একমাত্র নেশা মদ খাওয়া। ক্রমে ক্রমে বেশ কয়েক মাস কেটে গেল। গােমেজের জীবনের নানা ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা ক্রমে জানতে পেরেছিলাম। সে দুরন্ত সাহসী, কোন কিছুতেই তার কোন ভয় ছিল না। ইঞ্জিন যেন তার স্পর্শে নতুন জীবন লাভ
করত। দুরন্ত গতিতেই সেই ইঞ্জিন বিরাট মেল ট্রেন টেনে নিত। রেল কর্তৃপক্ষের কাছে গােমেজ ছিল অত্যন্ত প্রিয়।

কিন্তু মানুষ কত তুচ্ছ তা টের পেলাম আচমকাই। গােমেজ হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে মারা গেল একদিন ট্রেন চালানাের সময়েই। রেল কর্তৃপক্ষ অসহায় বােধ করতে শুরু করলেন। গােমেজের অভাব পূরণ হওয়ার নয়। আমারও ক্ষতি অপূরণীয়। মনটা ভেঙে গেল সকলেরই। ক্রমে শােকের ধাক্কা সকলেই সামনে নিলাম। আশ্চর্য ঘঠনা হল গােমেজের জায়গায় আমাকেই বেছে নেয়া হল। হেড ড্রাইভার হিসেবে। এরপর এল একরাত। বেশ বৃষ্টি পড়ছিল। রাত প্রায় নটা। ট্রেন তেজপুরের দিকে ছুটে চলেছে। আমার সঙ্গে

ইঞ্জিনে ছিল দুজন খালাসি আর ড্রাইভার। আমি ও অন্য একজন। যে খালাসি কয়লা দিচ্ছিল সে হঠাৎ বলে উঠলে : স্যর, সামনে আর লাইন নেই! ‘সেকি! চিৎকার করে সামনের দিকে তাকালাম। ‘সত্যিই তাই হেডলাইটের আলােয় পরিষ্কার দেখলাম কিছুটা দূরেই আর লাইনের চিহ্ন নেই! ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা
অনিবার্য! ‘সর্বনাশ কি হবে? চিৎকার করে উঠতেই একজন বিরাট দেহী মানুষ আমাকে প্রচণ্ড ধাক্কা মেরে ছিটকে দিয়ে চালকের দায়িত্ব নিতে চাইল। ‘কে? কে?’ আর্তনাদ করে উঠলাম। তারপর আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান ফিরতেই আমার সঙ্গী ড্রাইভার বলল, ‘স্যর তেজপুরে পৌছে গেছি। ‘তেজপুর?' বলে উঠে বসলাম। কিন্তু কিভাবে এটা সম্ভব হল? লাইন তাে সম্পূর্ণ অদৃশ্য ছিল। আর ওই বিশালদেহী মানুষটাই বা এল কোথা থেকে আর সে গেলই বা কোথায় ? তখনই বিদ্যুৎ চমকে মনে পড়ল লােকটা কি গােমেজ? নিশ্চয়ই তাই। ওই চেহারা তারই। কিন্তু তা কিভাবে সম্ভব? গােমেজ তাে মৃত।


তবে কি বিদেহী গােমেজ তার কর্তব্যরক্ষা করার জন্যই ট্রেনটিকে নিশ্চিত ধ্বংস থেকে রক্ষা করেছে ?
বাঁচিয়েছে কয়েকশ ট্রেন যাত্রীকে শূন্যে ট্রেন চালিয়ে ? কে দেবে একথার উত্তর। এতবছর পরেও সেদিনের সেই অভিজ্ঞতার স্বচ্ছতা এতটুকু ম্লান হয়নি।”
ছােটদাদুর কাহিনি এখানেই শেষ।

Post a Comment

If You Have Any Doubts, Please Let Me Know

নবীনতর পূর্বতন